বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাইব্যুনালেই জামায়াতে ইসলামীর নেতাসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। এবং তা কার্যকর করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
এবার এই আদালতেই বিচার হলো হলো শেখ হাসিনা নিজেরই। জুলাই অভ্যুথানে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এই আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা এই রায়কে ‘রাজনৈতিক প্রহসনমূলক’ বিচার বলে মন্তব্য করেছেন।
তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ন্যায়সংগততা এবং এটি পরিচালনার তড়িঘড়ি করার ধরন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, এটা অস্বীকার করা কঠিন যে শেখ হাসিনার সরকার বছরের পর বছর আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল। ঘনিষ্ঠ মহল সম্পদশালী হয়েছে; বিরোধীরা হয়েছে হয়রানির লক্ষ্য। শেখ হাসিনা, তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল এক ব্যক্তিপূজার রাজনীতি।

২০২৪ সালের গণবিক্ষোভের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে এই দমননীতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক জনরোষে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়, আর তিনি ভারতে আত্মনির্বাসনে যেতে বাধ্য হন—যে ভারত দীর্ঘদিন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। পরে নিজেই স্বীকার করেছিলেন—“আমরা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।” এরপর তার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়; এমনকি তার প্রয়াত পিতা ‘বঙ্গবন্ধু’কেও আন্দোলনকারীরা সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর; তবুও টেকসই রাজনৈতিক স্থিতি সেখানে অধরা। শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও তা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে ও বিরোধীদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণে।
আগামী বছর বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা। বিশ্বস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন আয়োজন করতে হলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
২০২৪ সালের নির্বাচন—যেখানে বিরোধীরা অংশ নেয়নি—আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এটাই ছিল শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ। তাই কোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিলে আবারও একই সংকট ঘনীভূত হবে।
অপরাধী সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে, কিন্তু প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে অতিমাত্রায় শাস্তিমূলক রায়—বিশেষত মৃত্যুদণ্ড—বাংলাদেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। দায়বদ্ধতার সঙ্গে পুনর্মিলন—পরিণত রাষ্ট্রব্যবস্থার এটাই বৈশিষ্ট্য।
শেয়ার করুন :










